পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় : উপাচার্য নিয়োগে রাজবংশী সংগঠনগুলোর দাবি
পশ্চিমবঙ্গের ৯০ শতাংশের বেশি তপশিলি জাতি, জনজাতি, অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষ। কিন্তু তাদের উন্নয়ন থমকে থাকছে শুধুমাত্র এদের মধ্যে থেকে সৎ, স্বচ্ছ, শিক্ষিত সমাজ কল্যাণকামী মানুষদের উপযুক্ত শিক্ষা, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের স্থান দেওয়া হচ্ছে না।
------ ডক্টর কৌস্তব মন্ডল
রাজবংশী সংগঠনগুলোর সাংবাদিক সম্মেলন
উত্তরবঙ্গে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজবংশী সম্প্রদায়ের উপাচার্য নিয়োগে সমস্ত রাজবংশী সংগঠনগুলো একজোট হয়েছে । তারা দাবি তুলেছেন, উত্তরবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী রাজবংশী সম্প্রদায়ের। আর এই সমাজের কল্যাণের জন্য রায়সাহেব পঞ্চানন বর্মা সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন । সেই পঞ্চানন বর্মার নামে উত্তরবঙ্গে 'পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়' স্থাপিত হয়েছে। অথচ সম্প্রতি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে সঞ্চারী মুখার্জি বিবেচিত হয়েছেন।উত্তরবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী রাজবংশী সম্প্রদায় তপশিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত। এক সময় তারা শিক্ষা দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে তাদের মধ্যে বহু মানুষ উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন। অথচ তাদের মধ্যে থেকে কোন উপাচার্য নিয়োগ করা হচ্ছে না। এই সম্প্রদায়ের মানুষকে বঞ্চিত করে, বর্ণহিন্দু সমাজের মানুষেরা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে বসে আছে ।
আন্দোলনের প্রধান মুখ রতন বর্মা বলেন, আমাদের এই প্রতিবাদ আমরা সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে চাই । এই প্রতিবাদের প্রধান উদ্যোগ নেন রাজবংশী এমপ্লয়িজ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, বিশ্ব রাজবংশী উন্নয়ন মঞ্চ এবং রাজবংশী ঐক্যমঞ্চের সদস্যরা ।
রাজবংশী এমপ্লয়েজ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক রতন বর্মাকে অনেকে প্রশ্ন করেন - 'কেন উপাচার্য রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে হতে হবে?'
রতন বর্মা খুব জোরের সঙ্গে বলেন "কেন নয়? পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষকে সম্মান জানিয়ে এবং রাজবংশী সমাজের স্বার্থে। উত্তরবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী রাজবংশী সম্প্রদায়। তাদের উন্নতি তখনই সম্ভব, যদি তাদের মধ্যে থেকে উপাচার্য হয়। বর্ণহিন্দু সমাজের মানুষেরা চিরকাল তপশিলি সমাজের মানুষদের হেয় করে এসেছে। তারা তপশিলি সমাজের মানুষের উন্নতির জন্য ততটা আন্তরিক নয়, এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক যে, একজন রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষই রাজবংশী তথা উত্তরবঙ্গের সমস্ত অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষের কল্যাণ করতে পারবে। এছাড়া রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এখন উপাচার্য হওয়ার মতো বহু যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষও রয়েছেন। তাহলে তাদের নাম কেন বিবেচিত হবে না?
এই ক্ষোভ তাদের মধ্যে রয়েছে, যারা পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতে তপশিলি জাতি, জনজাতি, অনগ্রসর শ্রেণী - যারা জনসংখ্যায় ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ।
সম্প্রতি পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছে রাজবংশী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন। তারা প্রতিবাদ জানিয়েছে তাদের মধ্যে উপযুক্ত শিক্ষিত মানুষ থাকা সত্ত্বেও কেন বর্ণহিন্দুদের মধ্যে থেকে উপাচার্য নিয়োগ হবে!
এবার এই উপাচার্য নিয়োগে রাজ্য সরকার, রাজ্যপাল বিরোধে সুপ্রিম কোর্টকে মাথা গলাতে হয়েছে। কিন্তু কোন পক্ষই নাম প্রস্তাবের ক্ষেত্রে রাজবংশীদের বিষয়টি মাথায় নিয়ে আসেনি। এর আগে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন রাজবংশী উপাচার্য নিযুক্ত হয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য।। কিন্তু সেখানে বর্ণহিন্দুদের দ্বারা তাকে অপমানিত হতে হয়েছিল ।
প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল সমগ্র রাজবংশী সমাজ ।
রাষ্ট্রের পরিচালকরা সেই বিষয়টা কি কোন গুরুত্বের মধ্যেই দেখেননি? আর সেই কারণেই কি কোন নিম্নবর্ণের মানুষকে উপাচার্য নিয়োগ না করে একজন বর্ণহিন্দুকে উপাচার্য নিয়োগ করা হলো! এই ঘটনা আঘাত করেছে রাজবংশী সম্প্রদায়ের আত্মসম্মানে। তার প্রতিবাদে উদ্বেলিত হয়েছে সমগ্র রাজবংশী সমাজ ।
যদি রাজবংশী সমাজের থেকে উপাচার্য নিয়োগ না হয়, তাহলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেবেন আগামী দিনে ।
এই সম্মেলন থেকে জানা যাচ্ছে, রাজবংশী এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মাননীয় রতন বর্মা ও তার সহযোগীরা কিছু অধ্যাপকদের নাম পাঠিয়েছিলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে। কিন্তু তার মধ্যে কোন নাম বিবেচিত হয়নি ।
এ বিষয়ে পৌন্ড্র মহাসংঘের কর্ণধার হারান চন্দ্র সরদার রাজবংশী সম্প্রদায়ের এই আন্দোলনকে সমর্থন করে জানিয়েছেন, তপশিলি জাতি, জনজাতির মানুষেরা সর্বদাই বঞ্চিত হচ্ছে তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও। কারণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় থাকছে বর্ণহিন্দু মানুষেরা ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পশ্চিমবঙ্গের বাগদি জনগোষ্ঠী একটি বৃহৎ সম্প্রদায় হওয়া সত্বেও তারা শিক্ষা থেকে শুরু করে সবকিছুতে পিছিয়ে থাকছে। তাদের উন্নয়নের জন্য কোন চেষ্টা হচ্ছে না। তার পিছনে বড় কারণ তাদের মানুষেরা কোন উচ্চপদে নেই। একইভাবে আরও বহু তপশিলি জাতি আছে তারা সঠিকভাবে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। কারণ, তাদের যথাযথ প্রতিনিধি উপযুক্ত জায়গায় নেই।
মূলনিবাসী পার্টি অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে ডক্টর কৌস্তব মন্ডল বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ৯০ শতাংশের বেশি তপশিলি জাতি, জনজাতি, অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষ। কিন্তু তাদের উন্নয়ন থমকে থাকছে শুধুমাত্র এদের মধ্যে থেকে সৎ, স্বচ্ছ, শিক্ষিত সমাজ কল্যাণকামী মানুষদের উপযুক্ত শিক্ষা, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলোতে তাদের স্থান দেওয়া হচ্ছে না। আর তারজন্য এই দেশে দুর্নীতির এত রমরমা।
এই লড়াই শুধু রাজবংশী সমাজের নয়, এ রাজ্যের আপামর মূলনিবাসী বহুজন সমাজের লড়াই । কারণ দেশের সমগ্র গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছে বর্ণহিন্দু সমাজের মানুষেরা।
---- কবি দিলীপ গায়েন
মূলনিবাসী বহুজন সমাজের অন্যতম লেখক কবি দিলীপ গায়েন বলেন, এই লড়াই শুধু রাজবংশী সমাজের নয়, এ রাজ্যের আপামর মূলনিবাসী বহুজন সমাজের লড়াই। কারণ দেশের সমগ্র গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছে বর্ণহিন্দু সমাজের মানুষেরা। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বর্ণহিন্দু মানুষেরা ।বঙ্গীয় বাগদী জাগরণ সমিতির সভাপতি প্রফুল্ল কুমার মাঝি বলেন, এই লড়াই শুধু রাজবংশীদের নয় এ রাজ্যের সমগ্র মূলনিবাসীদের লড়াই। আমরা রাজবংশীদের সঙ্গে সমব্যথী। এই রাজ্যে বাগদিরা একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্বেও তারাও একইভাবে বারে বারে বঞ্চিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে আমাদের প্রতিনিধি না থাকলে আমরা বঞ্চিত হব ----এটাই স্বাভাবিক।
আমরা জনসংখ্যায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের উন্নয়ন থমকে যাবে এবং যাচ্ছে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
----------------xx---------------

