লকুর কমিটি ও মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল
সুধীর রঞ্জন হালদার
বাংলাদেশের তপশিলি জাতির মানুষদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন- ‘ভারতীয়রা তো মহাপ্রাণের বদান্যতায় SC কোটায় কিছু পাচ্ছেন। আমাদের পূর্ববঙ্গীয়দের তিনি কি দিয়েছেন?’ অবশ্য পূর্ববঙ্গীয় অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশিদের মধ্যে তপশিলিভুক্ত জাতি বলে সরকার স্বীকৃত কোনো জাতি নেই।বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশি এই প্রজন্মের অনেকেরই সত্যিকারের ইতিহাস জানা নেই। SC/ST-র Reservation কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানের জনক জিন্নাহ্ও মেনে নিয়েছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর তপশিলি জাতির জন্য চাকরি, শিক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু জিন্নাহ্র হঠাৎ মৃত্যুর পরে যখন চরম সাম্প্রদায়িক লিয়াকত আলী ও তাঁর কোম্পানির তৎপরতায় মহাপ্রাণ নিজেই জীবনের আশঙ্কায় থাকতে পারলেন না সেদেশে, তখন কে আর রক্ষা করবে SC/ST -র Reservation?
তবে শিক্ষাক্ষেত্রে- স্কুলকলেজে SC/ST ছাত্রছাত্রীদের স্টাইপেণ্ড, হোস্টেল-গ্র্যান্ট, বইপত্র দেবার ব্যবস্থা কিন্তু চালু ছিল বাংলাদেশ সৃষ্টি হবার আগে পর্যন্ত। এবং সেটা ছিল মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথের বদান্যতারই ফল। ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে পড়া শেষ হলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কলেজে পড়া পর্যন্ত স্টাইপেণ্ড ও হোস্টেলে থাকার সময়ে হোস্টেলগ্রাণ্ট পাওয়া যেত। তবে সে সময় কিছুটা সীমিত আকারে, যারা একটা নির্দিষ্ট নম্বরের বেশি নম্বর পেত, তারাই স্টাইপেণ্ড পেত। আমি নিজেই স্কুলে পড়ার সময় স্টাইপেণ্ড পেয়েছি। কলেজে পড়ার সময় স্টাইপেণ্ডের সঙ্গে হোস্টেলগ্রাণ্টও পেয়েছি।
পূর্ববাংলা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হলে তপশিলি জাতির অস্তিত্ব আর রইল না। ভারতেও তপশিলি জাতির তালিকা থেকে নমঃশূদ্র, রাজবংশী, শুঁড়ি ও ধোপা- এই চারটি জাতিকে বাদ দেবার চক্রান্ত হয়েছিল। এজন্য সরকার ‘লকুর কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠন করেছিল। সে সময়ও মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথের তৎপরতার ফলেই ওই চারটি জাতিকে তপশিলি জাতির তালিকা থেকে সরকার বাদ দিতে পারেনি।
ষাটের দশকে তপশিলি জাতির তালিকার রদবদল সম্পর্কে স্যার বি.এন. লকুর, আইসিএস.-কে চেয়ারম্যান করে ভারত সরকার যে কমিটি গঠন করেছিলেন সেই কমিটিকে ‘লকুর কমিটি’ বলা হয়।
ষাটের দশকে তপশিলি জাতির তালিকার রদবদল সম্পর্কে স্যার বি.এন. লকুর, আইসিএস.-কে চেয়ারম্যান করে ভারত সরকার যে কমিটি গঠন করেছিলেন সেই কমিটিকে ‘লকুর কমিটি’ বলা হয়। ওই কমিটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুধু মাত্র বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক অনুন্নত শ্রেণি সংঘের সাধারণ সম্পাদক যোগেশ চন্দ্র বিশ্বাস ও পশ্চিমবঙ্গ অনুন্নত শ্রেণি সংঘের সাধারণ সম্পাদক কালিচরণ দাস- এই দুইজন কমিটির সামনে উপস্থিত হলে তাঁদের মতামত গ্রহণ করে। এছাড়া একজন লোকসভার সদস্য বি. মণ্ডল উপস্থিত হয়ে তাঁর মতামতও ব্যক্ত করেন। সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রতিনিধি ওই কমিটির কাছে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে উপস্থিত হননি। এই লকুর কমিটি ১৯৬৫ সালে তাঁদের রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গের তপশিলি জাতির তালিকা থেকে নমঃশূদ্র, রাজবংশী, শুঁড়ি ও ধোপা- এই চারটি জাতিকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে।
এছাড়া অন্য কয়েকটি রাজ্যেও বিশেষ বিশেষ কয়েকটি সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এই সুপারিশের প্রতিবাদে কলকাতার ভারত সভা হলে মুকুন্দ বিহারী মল্লিকের সভাপতিত্বে তপশিলি জাতিগুলি মিলিত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা করে। লকুর কমিটির সুপারিশ যাতে পার্লামেণ্টে গৃহীত না হয়, সেই উদ্দেশ্যে ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছে ডেপুটেশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ওই ডেপুটেশনের নেতৃত্ব দেবার ভার পড়ে যোগেন্দ্রনাথের উপর। সেই উদ্দেশ্যে এ্যাডভোকেট রমেশচন্দ্র মন্ডল, অপূর্বলাল মজুমদার, মহানন্দ হালদার প্রমুখ কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে তিনি দিল্লিতে যান। দিল্লিতে পৌঁছে যোগেন্দ্রনাথ প্রথমে ফোনে সময় নির্ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুধুমাত্র অ্যাডভোকেট রমেশচন্দ্র মন্ডল। দিল্লী পৌঁছবার পর অপূর্বলাল মজুমদার ও মহানন্দ হালদার যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে তেমন আর যোগাযোগ রাখেননি বলেই মনে হয়। যোগেন্দ্রনাথ লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, নমঃশূদ্র সম্প্রদায় প্রধানত পূর্ববাংলার অধিবাসী ছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন কৃষিজীবী। দেশভাগ হওয়ার পরে তাঁরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে আসেন। ফলে আজ তাঁরা প্রায় সকলেই পশ্চিমবঙ্গে খেতমজুর বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কিছুসংখ্যক তপশিলি ছাত্র বৃত্তি পেয়ে কিছুটা লেখাপড়া শিখে সংরক্ষণের সুযোগ পেয়ে দু-চারজন সরকারি চাকরি পেয়ে কোনো প্রকারে জীবিকানির্বাহ করছেন। পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের জনসংখ্যা ৩০-৪০ লক্ষের মতো। সুতরাং তাঁদের যদি তপশিলি জাতির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে তাঁদের ভবিষ্যৎ চিরকালের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে এবং তপশিলি ছাত্রবৃত্তির সাহায্যে তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষালাভের যেটুকু সুযোগ বর্তমানে রয়েছে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
যোগেন্দ্রনাথ লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, নমঃশূদ্র সম্প্রদায় প্রধানত পূর্ববাংলার অধিবাসী ছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন কৃষিজীবী। দেশভাগ হওয়ার পরে তাঁরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে আসেন। ফলে আজ তাঁরা প্রায় সকলেই পশ্চিমবঙ্গে খেতমজুর বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন।
তিনি শুঁড়িদের সম্পর্কে বলেন যে, তাঁদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন হচ্ছে দেশি মদ তৈরি করা ও দেশিবিদেশি মদের ব্যাবসা করা। এদের মধ্যে হয়তো কেউ মদের ব্যবসা করে আর্থিক স্বচ্ছলতা লাভ করেছেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এঁরা গরিব এবং শিক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত পিছিয়ে। এঁরা যদি তপশিলি তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান, তবে শিক্ষালাভ ও সরকারি চাকরি পেয়ে ভবিষ্যতে তাঁদের উন্নতি লাভের কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।
রাজবংশীরা পশ্চিমবঙ্গে বৃহত্তম তপশিলি সম্প্রদায়। চাষবাস ও মাছ ধরাই তাঁদের প্রধান জীবিকা। তাঁরা সবচেয়ে গরিব এবং বেশিরভাগই নিরক্ষর। তাঁদের অবস্থা যে কী শোচনীয় তা নিজের চোখে না দেখলে বুঝা যাবে না। ধোপাদের অবস্থাও একই রকম। পশ্চিমবঙ্গে এইসব সম্প্রদায়ের মোট জনসংখ্যা ৬০-৭০ লক্ষের মতো হবে। এঁদের তপশিলি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া খুবই অমানবিক কাজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী যোগেন্দ্রনাথের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং তাঁকে আশ্বাস দেন যে, লকুর কমিটির সুপারিশ যাতে কার্যকরী না হয়, তা তিনি অবশ্যই দেখবেন।
যোগেন্দ্রনাথ একথাও জানিয়ে দেন যে, নমঃশূদ্রসহ এইসব সম্প্রদায়ের মানুষেরা লকুর কমিটির এই রিপোর্টে যারপরনাই হতাশ এবং উত্তেজিত। লকুর কমিটি এই সমস্ত সম্প্রদায়ের যেসব সামাজিক সংগঠন আছে, তাঁদের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ না করে, তাঁদের মতামত না শুনেই কীভাবে এমন একটা সুপারিশ করলেন, তাতে তাঁরা দারুণভাবে ক্ষুব্ধও। পশ্চিমবঙ্গে এ নিয়ে যে ভাবে আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে, তাতে যদি সত্বর এই সুপারিশ রদ করা না হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও ঘটে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী যোগেন্দ্রনাথের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং তাঁকে আশ্বাস দেন যে, লকুর কমিটির সুপারিশ যাতে কার্যকরী না হয়, তা তিনি অবশ্যই দেখবেন।
বাম দিক থেকে : প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী, যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল এবং এডভোকেট রমেশচন্দ্র মন্ডল
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়েও যোগেন্দ্রনাথ পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। তিনি রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। ওইদিনই রাষ্ট্রপতি রাত্রে একটি ডিনার পার্টি ডেকেছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে যোগেন্দ্রনাথকে ডিনার পার্টিতে নিমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন যে, ডিনার পার্টিতে এলে এ বিষয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন। সন্ধ্যায় যোগেন্দ্রনাথকে ডিনার পার্টিতে নিয়ে যাবার জন্য রাষ্ট্রপতি গাড়ি পাঠিয়ে দেন। যোগেন্দ্রনাথ রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছলেই তিনি তাঁর সঙ্গে একান্তে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেন। রাষ্ট্রপতি জানালেন যে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে যোগেন্দ্রনাথের প্রসংশনীয় ভূমিকার কথা তিনি অবগত আছেন। তিনি যোগেন্দ্রনাথের বক্তব্য শুনে লকুর কমিটির সুপারিশ যাতে কার্যকরী না হয়, সেজন্য যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দেন। ফলস্বরূপ তপশিলি তালিকা থেকে কোনো সম্প্রদায়কেই আর বাদ দেওয়া হয়নি।তিনি (রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান) যোগেন্দ্রনাথের বক্তব্য শুনে লকুর কমিটির সুপারিশ যাতে কার্যকরী না হয়, সেজন্য যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দেন। ফলস্বরূপ তপশিলি তালিকা থেকে কোনো সম্প্রদায়কেই আর বাদ দেওয়া হয়নি।
তাহলে সংরক্ষণের কোটায় নির্বাচিত হয়ে তাঁরা কেন এ ব্যাপারে নিশ্চেষ্ট রইলেন? তাঁরা কি শুধু দলদাস হয়ে বর্ণহিন্দুর চামচাবৃত্তি করার জন্যই এম.পি. বা এম.এল.এ. হয়েছেন সংরক্ষিত কোটায়?
অপরদিকে যোগেন্দ্রনাথের ভূমিকা দেখুন- সরকারি কোনো পদে না থেকে, এম.পি.-এম.এল.এ. না হয়েও তিনি ছুটে গিয়েছেন তপশিলি জাতির স্বার্থরক্ষার কাজে। বলতে গেলে একরকম ছিনিয়েই এনেছিলেন ওই চারটি তপশিলি জাতির সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে। গরিব অসহায় তপশিলি জাতির জন্য তাঁর এই যে দরদ, এইজন্যই তিনি মহাপ্রাণ; মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ।


