স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও সুন্দরবনের মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে আজও বিচ্ছিন্ন।
সুন্দরবনের মানুষ ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্নপীযূষ গায়েন

সুন্দরবনের মানুষ, পশু, জঙ্গল, জলাভূমি সবাইকে বাঁচাতে হবে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা নদীর বদ্বীপে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করে।
ভারতের সুন্দরবন, দেশের মোট ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ৬০% এরও বেশি। প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর এলাকা নিয়ে সুন্দরবন এখন ভারতের অন্যতম সংরক্ষিত জলাভূমি। বিশ্বে এখনো পর্যন্ত ২৪৯১ টি রামসার সাইট বা বৃহত্তম জলাভূমি যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে মোট ৪৬টি রামসার সাইট আছে আর তার মধ্যে সুন্দরবন ২৭তম রামসার সাইট। বিশ্বে আন্তর্জাতিক জলাভূমি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে ২রা ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ ইরানের রামসার শহরে। আর ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ তারিখে এটি ভারতের জন্য কার্যকর হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গুরুত্বের রামসার সাইটের এই জলাভূমিগুলোকে স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংরক্ষণ করার কথা ঘোষিত হয়। ২০২৩ সালে প্রায় ১৭১ টি দেশ তাদের সম্মতি প্রকাশ করেছে এই জলাভূমি সংরক্ষণে। অনেকেই স্বীকার করেন সুন্দরবন কোলকাতার ফুসফুস, যা কোলকাতার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছে।
সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ২১শে মে ১৯৯২ সালে ৪২৬৪ বর্গমাইল বা ৬৮৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত হয়। এর মধ্যে সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যান ১৩৩০ স্কোয়ার কিলোমিটার নিয়ে এবং সজনে খালি ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি ৩৬২ স্কোয়ার কিলোমিটার জুড়ে তৈরী হয়েছে।
১৯৮৪ সালে বাঘ সংরক্ষণের জন্য সুন্দরবনে প্রতিষ্ঠিত হয় সুন্দরবন জাতীয় ব্যাঘ্র উদ্যান আর ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায় সুন্দরবন। ২০০১ সালে ইউনেস্কো দ্বারা সুন্দরবনকে একটি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসেবে ও মনোনীত করা হয়েছে। বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ শুধু পশু, পাখি, গাছ নয়, সেখানকার মূল অধিবাসীদেরও উন্নত পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রাও এর অর্ন্তগত।
এবার আসা যাক অন্য গল্পে । সুন্দরবনে মানুষের বসতি বহু প্রাচীন কাল থেকেই, মৌর্য যুগের ও আগে থেকে। বাংলাদেশের খুলনা জেলা আর ভারতের অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলা নিয়েই মূলত সুন্দরবন । পুণ্ড্রবর্দ্ধন, মহাস্থানগড়, পৌণ্ড্র জনগোষ্ঠী ইত্যাদি বিষয় ও জড়িত।
এই প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলায় আবিষ্কৃত সাংখ্যদর্শনের প্রবক্তা পৌণ্ড্র জনগোষ্ঠীর মানুষ কপিল মুনির আবাস স্থল। আর সবচেয়ে যুক্তিবাদী দর্শন,” সাংখ্য দর্শন” সবচেয়ে বেশী অনুপ্রাণিত করেছিল গৌতম বুদ্ধকে। বর্তমানে গঙ্গাসাগরে এই কপিল মুনির আশ্রম আছে এবং সেই উপলক্ষে গঙ্গাসাগর মেলা হয়।
সুন্দরবন তৈরি হয়েছে ১৯ টি ব্লক নিয়ে। এই ১৯ টি ব্লক আবার দুটি প্রশাসনিক জেলার নিয়ন্ত্রণে, একটি দক্ষিণ ২৪ পরগনা আর একটি উত্তর ২৪ পরগনা। সুন্দরবনের ১৯টি ব্লক যথাক্রমে ক্যানিং-১, ক্যানিং-২, বাসন্তী, গোসাবা, হিংগলগঞ্জ, হাসনাবাদ, সন্দেশখালী-১, সন্দেশখালী-২, হাড়োয়া, মিনাখা, কুলতলী, সাগর, নামখানা, কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা, ম্থুরাপুর-১, মথুরাপুর-২, জয়নগর -১, জয়নগর -২। আর এই ১৯ টি ব্লকে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষের বাস ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে। এক একটি ব্লকে প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ লোক বাস করে। বর্তমানে এই জনসংখ্যা ৫০ লাখের বেশী হয়ে গেছে।
একটা ব্লকের উদাহরণ তুলে ধরা যাক – গোসাবা ব্লক ২০১১ এঁর সেন্সাস অনুসারে জনসংখ্যা – ২৪৬৫৯৮
{ হিন্দু-২১৭১৫৫ (৮৮.০৬%), মুসলমান-২১,২৮৬ (৮.৬৩%), খ্রীষ্টান—৩২০০(১.৩%), বুদ্ধিষ্ট -৫৪(০.০২%), শিখ-৩৮(০.০২%), জৈন-২৯(০.০১%), অন্যান্য-২৩৯১ (০.৯৭%), ধর্মহীন-২৪৪৫(০.৯৯%)
তপশিলি জাতি -১৫৪৫৮৪, তপশিলি জনজাতি- ২৩৩৪৩ –অর্থাত সমগ্র হিন্দুদের মধ্যে শুধু এস সি, এস টিদের জনসংখ্যা ৮২% (এস সি -৭১%, এস টি ১১%)। আর বাকি বেশীরভাগ মানুষ অনগ্রসর শ্রেণীর (তাঁতী, কৈবর্ত, কর্মকার, গোয়ালা, স্বর্ণকার ইত্যাদি) মধ্যেই পড়ে।
কোলকাতার খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরে ও এরমধ্যে বহু দ্বীপ অধ্যুষিত কয়েকটি ব্লক আজও পর্যন্ত ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। শুধু তাই নয়, এখানে সেরকম কোনো ভালো স্কুল নেই, কলেজ নেই, বড়ো কোন হাসপাতাল নেই। কোন মানুষ অসুস্থ হলে তাদেরকে নদীপথেই শহরে আনতে হয় । পড়াশোনার জন্য সেরকম কোনো ভালো কলেজ নেই, কোন ভালো কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই।
নদী বাঁধগুলোর দুরবস্থা কহতব্য নয়। আয়লার পর তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। নদীর বা সমুদ্রের লোনা জল ঘরবাড়ি, চাষের জমি নষ্ট করেছে বারবার। সুন্দরবনের নিম্নবর্গের দরিদ্র মানুষ শিক্ষা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে । ফলে এই অঞ্চলে বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে রয়েছে এই জল জঙ্গলের উপরে । মাছধরা, চিংড়ির মিন সংগ্রহ, কাঠ সংগ্রহ, কাঁকড়া ধরা, মধু সংগ্রহ করার জন্য তারা পেটের টানে গভীর জঙ্গলে যায় বাঘের, কুমীরের ভয়কে উপেক্ষা করে । সুন্দরবনের মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া এগুলো শুধু দেশের মধ্যে নয়, বিদেশেও রপ্তানি হয়।
সুন্দরবনে ১০৪ টা দ্বীপ আছে তার মধ্যে ৫৪ টা দ্বীপে প্রায় ৪৮ লাখ মানুষের বসবাস ! ২০০৯ সালের মে মাসে আয়লা সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। বহু বছরের পুরনো মাটির বাঁধ ভেঙে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি, জমি, গাছ, গৃহপালিত পশু সব লবণাক্ত জলে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে!
এছাড়া ৩০০এরও বেশি মানুষের জীবনহানি ঘটে। প্রায় চার লাখের মাটির কাঁচা বাড়ি নষ্ট হয় । লক্ষ লক্ষ গৃহপালিত পশু মারা যায় । শুধু দেশের মানুষ নয়, বিদেশের মানুষের নজরে আসে কত অকল্পনীয় দুর্দশার মধ্যে কাটায় সুন্দরবনের মানুষ। এতদিন পরে সরকারের টনক নড়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকার জুন ২০০৯ অর্থাৎ পরের মাসেই একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন তথা সুন্দরবনের মানুষদের উন্নয়নের জন্য। নদী বাঁধগুলোর মেরামত, ফ্লাড সেন্টার, উপযুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি নির্মাণে। টাস্ক ফোর্স ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। পরিকল্পনা তৈরী হয়, একটি স্বল্পমেয়াদী এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার।
স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনায় অন্যান্য ব্যাবস্থার সঙ্গে সবচেয়ে খারাপ ৭৭৮ কিলোমিটার বাঁধ, সেগুলো সবার আগে দ্রুত নির্মাণ হবে। আর দীর্ঘমেয়াদীতে আড়াই হাজার কিলোমিটার নদী বাঁধ তৈরি হবে। আর এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ডিটেইল প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করতে হবে ফেব্রুয়ারি ২০১০ এর মধ্যে। অথচ সেই রিপোর্ট আর তৈরী হল না।
স্বল্পমেয়াদী যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল ৭৭৮ কিলোমিটার নদী বাঁধ দ্রুত নির্মাণ করতে হবে যা তখন ভেঙেচুরে সমতল হয়ে গেছে। সেখানে যে বাঁধ ছিল তা বোঝার উপায় নেই, সেরকম অবস্থায় চলে এসেছে। এই নির্মাণের পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ ও জলপথ দপ্তরকে। অক্টোবর ২০১০ সালের মধ্যে এই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য ৫০৩২ কোটি টাকা প্রশাসনিক ব্যয় বরাদ্দ অনুমোদিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ২০১৩ সালের মার্চের মধ্যে এই কাজ সম্পূর্ণ করার। এই ৫০৩২ কোটি টাকার মধ্যে বাঁধ নির্মাণের জন্য ৪২৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল । আর সেই কাজ মার্চ ২০১৩এর মধ্যে শেষ করার কথা ছিল । ইতিমধ্যে ভারত সরকার এখানে টাকা দিয়েছিল ৫২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, আর রাজ্য সরকার দিয়েছে ১১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। মোট ব্যয় হয়েছে পাঁচ বছর ধরে ১৯৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা । ভারত সরকারের দেওয়ার কথা ৭৫ শতাংশ আর রাজ্য সরকারের অংশ ২৫ শতাংশ ।
এখন দেখা যাচ্ছে মাত্র ১ শতাংশেরও কম কাজ হয়েছে। ৭৭৮ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র সাড়ে ছ কিলোমিটার বাঁধ নির্মিত হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে ৪২৪৫ কোটি টাকার মধ্যে মার্চ ২০১৫ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ৯১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা । ২০০৯ সালের আয়লার ভয়াবহ দুর্যোগের পরেও ২০১৯ এর বুলবুল, ২০২০তে আম্ফানের মোকাবিলা করতে হয়েছে সুন্দরবনের এই সব হারানো মানুষগুলোকে। কোন তরফে কোন প্রতিবাদ নেই।
এই নিম্নবর্গের দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষগুলোর দিকে ফিরে দেখারও কেউ নেই। এমনকি এখান থেকে যারা শিক্ষিত হয়ে বেরিয়ে এসেছে তারাও এই যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে তাদের অনেকেই তাদের শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। সরকারপক্ষ কিংবা বিরোধীপক্ষ কেউই তাদের বঞ্চনার কথা তুলে নিয়ে আসে না। তাই এখন বেশিরভাগ পরিবারের মানুষের সরকারি পরিচয়, “পরিযায়ী শ্রমিক”।
সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, প্রায় আটচল্লিশ লাখের উপরে মানুষ বাস করে। অথচ কতটা অবহেলিত তা উপরের তথ্যগুলো দেখলে বহু মানুষের চোখ খুলে যাবে আশা করি। এর পরে আসি ১৯ টা ব্লকের মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্লক দ্বীপের কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। আর সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল গোসাবা, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি। এছাড়া সাগর, নামখানা, বাসন্তী, কুলতলী এই ব্লকগুলো আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন।
কলকাতার খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত গোসাবা ব্লক। যেখানে কিছু কিছু ছোট ছোট ব্রিজের মাধ্যমে সমস্ত ভূখণ্ডগুলোকে যোগাযোগ করে নেওয়া খুব সহজ ছিল, অথচ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও এই ভূখণ্ডগুলি এখনো পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন আছে।
যেখানে পাহাড় কেটে রাস্তা হচ্ছে, গঙ্গার মত অত বৃহৎ নদীর উপরে ব্রিজ হচ্ছে, তার নিচ দিয়ে মেট্রো তৈরি হচ্ছে, সেখানে সুন্দরবনের যে সমস্ত জায়গায় ছোট ছোট নদীর উপর ব্রিজ করে হাজার হাজার মানুষের যোগাযোগের ব্যবস্থাটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়, তা কিন্তু করা হচ্ছে না।
গোসাবা, বাসন্তী, সন্দেশ খালী, হিংগলগঞ্জ, পাথরপ্রতিমা ব্লকের মধ্যে যোগসূত্র বহু ব্রীজ ২০ বছরের বেশী অনুমোদিত হয়ে আছে অথচ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যেমন চূণাখালী, পাঠানখালী, গদখালী-গোসাবা, বেলতলী-কচুখালী, কচুখালী-মোল্লাখালী এরকম অনেক ব্রিজ শুধু তৈরী হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়, কিন্তু প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না । দরিদ্র মানুষদের মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে গ্রাম্য দলীয় লড়াই লাগিয়ে দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে।
যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস করে, স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও সেই সুন্দরবন ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আজও আলাদা । সেখানে পৌঁছাতে হলে অনেকগুলো বাহনের উপর নির্ভর করতে হবে । ট্রেন, বাস, অটো, ভ্যান তো আছেই। আর সবচেয়ে বেশী সময়ের অপচয় হয় নৌকা পারাপারে। শুধু সময় ব্যয় হয় তাই না, সাধারণ গরীব মানুষের সামান্য পথ যাতায়াতে অর্থ ব্যয় তিনচারগুণ বেশী। অথচ এখানকার বেশীরভাগ মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা নেই। বেশীরভাগ পরিবার এখন পরিযায়ী শ্রমিক।
সুন্দরবনের বেশিরভাগ মানুষ নিম্নবর্গের মানুষ আর এদের থেকে ধর্মান্তরিত দরিদ্র মুসলমান, খ্রীষ্টান মানুষেরা। তারা কলকাতার খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য শহরের শিক্ষিত বর্গের খুব বেশি হেলদোল নেই ।
সুন্দরবনের দ্বীপগুলোয় লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস করা সত্ত্বেও বলতে গেলে প্রায় একটাও কলেজ নেই। যে দু-চারটি কলেজ আছে তা আসলে মূল ভূখণ্ডে। গোসাবা ব্লকে যে কলেজটি আছে তার নাম পাঠানখালী কলেজ। যেখানে বহু বছর ধরে কোন অনার্স ছিল না । সদ্য দু একটি সাবজেক্টে অনার্স শুরু হয়েছে। আর সেখানে যে সমস্ত কলেজের শিক্ষকরা পড়ান তারা বেশীরভাগ থাকেন, কোলকাতা বা তার আশেপাশে। তাদেরকে রোজ যাতায়াত করতে হয় নদী পেরিয়েই। শুধু তাই না, যে সমস্ত স্কুল আছে, আগে স্থানীয় শিক্ষক থাকলেও এখন বেশিরভাগ শিক্ষক শহরের। এবং তারাও একটানা কোনভাবে যেতে পারেন না। তাদেরকেও যেতে হয় নদী পেরিয়ে।
সুন্দরবনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম পরিকল্পনা হয়েছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম । ক্যানিং এর মাতলা নদীর উপর ট্রেন লাইনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নদীর উপরে ব্রিজের পিলারও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সবাই কেমন ঘুমিয়ে পড়েছে।
সুন্দরবনের জঙ্গলের মাছ, কাঁকড়া একসময় লঞ্চে করে আসতো এখন নদীপথ বুজে যাওয়ায়, বহুবার ব্রেক জার্নি করে সেই মাছ, কাঁকড়া শহরে বিক্রি করতে আনতে হয়। ক্যানিংকে বলা হয় “গেটওয়ে অফ সুন্দরবন”। এখান থেকেই রওনা হতে হয় সুন্দরবনের ফরেস্ট অফিস সজনেখালীর উদ্দেশ্যে।
মাতলা নদীর বিশাল চর তৈরি হয়েছে আজ থেকে বহু বছর আগে। একসময় পরিকল্পনা হয়েছিল মাঝখান দিয়ে রাস্তা টেনে নিয়ে যাওয়া হবে । দু পাশে থাকবে জঙ্গল। হরিণ এবং কিছু কিছু বন্যপ্রাণী সেখানে ছেড়ে দেওয়া হবে। রাস্তার দুপাশে থাকবে তারের বেড়া। জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে মানুষ চলাচল করবে। গাড়ি যাতায়াত করবে এবং একই সঙ্গে তারা সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বাসন্তী ব্লক পেরিয়ে মূল সুন্দরবন গোসাবা ব্লকের দিকে রওনা হবে।
তার পরিবর্তে, পরিবেশ দূষণকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকে তোয়াক্কা না করে সেই চর দখল করে নিয়েছে পরিকল্পনাহীন ভাবে বহু দোকান, সরকারি অফিস আরো অনেক কিছু। দোকান অবশ্যই হতে পারতো, কিন্তু সেটা পরিকল্পিতভাবে হওয়া উচিত ছিল, দলীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় নয়।
বহু পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলে যাতায়াত ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নতি হলে সুন্দরবনের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সুন্দরবনের মানুষেরা থেকেছে সর্বদাই বঞ্চিত। শুধু গালভরা নাম বয়ে চলেছে অয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
গ্ণতন্ত্রে প্রতিটা মানুষেরই সম্মান পাওয়ার কথা। আর্থিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সামাজিক পরিকাঠামো সব কিছুতেই। শহরের মানুষদের সামাজিক পরিকাঠামো নির্মাণে যে ব্যয় হয় সুন্দরবনের মানুষের পিছনে কি তার ৫শতাংশ করা হয় ? অথচ তারাই এদেশের শ্রমজীবী মানুষ। তারাই এদেশের জিডিপির বড়ো উৎপাদক।
এ দেশের জিডিপি অনুসারে গড়ে প্রতিটি মানুষের আয় হওয়ার কথা প্রতি মাসে ১৭ হাজার টাকা। একটি ৫ জনের পরিবার হলে সেই পরিবারের আয় হওয়ার কথা ৮৫০০০ টাকা প্রতি মাসে। সুন্দরবনের কটা পরিবারের মাসে এই আয় আছে ? তার বড়ো কারণ যে পরিকাঠামো গড়ে ওঠার কথা তা হয়নি।
সুন্দরবন ১৯৮৭ সালে ঘোষিত হয় সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। আর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা “আয়লা” সুন্দরবনকে তছনছ করে দিয়েছে ২০০৯ সালের মে মাসে। আয়লার ভয়াবহতা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সমগ্র ভারত তথা বিশ্বের মানুষকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। সুন্দরবনে হাহাকার পড়ে যায়। হাজার হাজার গৃহপালিত পশু শুধু নয়, তিনশ এর বেশি মানুষ মারা যায়, চার লাখেরও বেশি মাটির কাঁচা বাড়ি ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।
প্রতিটা নদীবাঁধের উপরে ব্রীজ নির্মাণ করা দরকার। যেখানে শহরে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেখানে গ্রামের সুন্দরবনের মতো জায়গায় যা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, সেখানকার মানুষ বঞ্চিত হবে এটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
যত দ্রুত সম্ভব সুন্দরবনের প্রতিটি অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা এবং মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ নির্মিত হয়, তা নিশ্চিত করা। চুনাখালি, পাঠানখালী, কচুখালী, মোল্লাখালি, গোসাবা এই ব্রিজগুলো সবার আগে হওয়া দরকার । আওয়াজ উঠুক সর্বত্র।
সুন্দরবনের অফুরন্ত সম্পদ। শুধুমাত্র বনের সম্পদ নয়, শুধুমাত্র পর্যটন শিল্প নয়, এখানকার মাছ, কাঁকড়া, মধু নয়, এখানে লঙ্কা তরমুজের চাষও বিখ্যাত। ফিশারি, সোলার কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ দরকার। নদীবাঁধের পাশে চরগুলোতে বনসৃজনের প্রচুর সুযোগ আছে । একদিকে যেমন সম্পদ সৃষ্টি হবে, তেমনি পরিবেশ সুরক্ষিত হবে।
সুন্দরবনের মানুষের জন্য আবাস যোজনার মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে বহুতল বিল্ডিং তৈরি করে দেওয়ার পরি কল্পনা দরকার, যা ঝড়ে বা বন্যায় ধূলিসাৎ হয়ে যাবে না। যদি দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য ব্রিজগুলো নির্মিত হতো, নদীবাঁধের যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করার কথা ছিল তা যদি করা হতো, তাহলে আজ সুন্দরবনের মানুষ এক উন্নত জীবনযাপন করতো এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
স্বল্পমেয়াদী, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথাই শুধু হবে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, ফল শূন্য । আয়লা, আম্ফান, বুলবুল এরা শুধু সুন্দরবনের মানুষের জন্য হাহাকার বয়ে আনবে। সুন্দরবনের অসচেতন, অশিক্ষিত মানুষদের কোন প্রতিবাদ নেই। এই স্বল্পমেয়াদী ৫০৩২ কোটি টাকা যদি সুন্দরবনের জন্য ব্যয় হতো, শুধু পরিকাঠামো নয়, সুন্দরবনের মানুষের আর্থসামাজিক পরিবর্তন সম্ভব ছিল। সুন্দরবনকে বাঁচাতে, সুন্দরবনের মানুষদের বাঁচাতে, পরিবেশ বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
-----------xx----------
