বাংলার কায়স্থ বৈদ্যরা ঠিক কোন অবস্থানে
পীযূষ গায়েন
একদিকে কায়স্থরা না কোন অনগ্রসর সমাজের মানুষ, আবার চতুঃবর্ণ ব্যবস্থায় এরা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যের মধ্যে পড়ছেন না। তাহলে তারা কোন অবস্থায় আছে?
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলার কায়স্থ বৈদ্যরা শুদ্র সমাজের মানুষ! অনেকে অস্বীকার করলেও তার ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে। এনারা জেনারেল হিসেবে নিজেদের গণ্য করেন। বাংলার ব্রাহ্মণরাও জেনারেল। কিন্তু মজার ব্যাপার উপনয়ন ব্রাহ্মণের হয়. আর বিয়ে, পূজা, শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণকেই ডাকা হয়। তারাই পৌরহিত্য করেন। সেখানে অন্য সমাজের কোন ভূমিকাই নেই ।
অর্থনৈতিকভাবে বিয়ে, পূজা, শ্রাদ্ধের নামে সমাজে এক বিশাল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়। আর তার পুরো ভাগটাই ব্রাহ্মণ সমাজ আত্মসাৎ করেন । অথচ অন্য যারা জেনারেল, তার ছিটে ফোটাও তারা পান না । কিংবা তারা সেই সামাজিক সম্মান ও ভোগ করেন না। এই ব্যবস্থাটাই অনগ্রসর সমাজের মানুষেরা ব্রাহ্মণ্যবাদ নামে আখ্যা দিয়েছেন।
দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা ছিল বৌদ্ধময়। দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণ বাংলায় বল্লাল সেনের আমলে যে সেন্সাস হয় সেখানে দেখা যায় মাত্র ৮০০ ঘর ব্রাহ্মণ্যধর্মের মানুষ ছিলেন আর বাকি সবাই বুদ্ধিস্ট। দীনেশ চন্দ্র সেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নীহাররঞ্জন রায়ের এদের লেখার মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তৃত বর্ণনা আছে ।
তাহলে এখান থেকে পরিষ্কার বাংলার কায়স্থ বৈদ্যরাও বুদ্ধিস্ট ছিলেন। কায়স্থ বৈদ্যরা বহুদিন পর্যন্ত বেদ পড়ার সুযোগ পাননি। ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণরা যেমন নিজেরা শাস্ত্র লিখেছে ; তেমনি শাস্ত্রে প্রথমে বর্ণবৈষম্য সৃষ্টি করেছে ; তারপরে জাতি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে ! শূদ্র সমাজের মধ্যে হাজার হাজার জাতি তৈরি করেছে ! আর তাদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়েছে !
আজ সেই নিপীড়িত বঞ্চিত জাতিগুলি তারা বাবাসাহেব আম্বেদকরের সংবিধানের সুযোগ নিয়ে, শিক্ষার আলো পেয়ে তারা নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করেছে! কায়স্থ বৈদ্যরা তারা না ব্রাহ্মণদের সঙ্গে একই রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, আবার না তারা ভারতের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী এস সি, এস টি, ওবিসি অর্থাৎ অনগ্রসর সমাজ তাদের সঙ্গে একাত্ম হতে পারছে। ইতিমধ্যে সারা ভারতে জাতি গণনার জনআন্দোলনের ফলে সরকারের হাজার বিরোধিতা সত্বেও সরকারকে ঘোষণা করতে হয়েছে জাতি গণনার। যদিও এই জনগণনা ইচ্ছাকৃত ভাবে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ।
২০২১ সালে জনগণনার কথা থাকলেও তা ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়ে নিয়ে চলছে। আজ হোক কাল হোক ভারতে জাতিগণনা হবেই। আর তখন কায়স্থ বৈদ্যরা নিজেদের আলাদা করে রাখলে সংখ্যালঘু হিসেবে প্রতিপন্ন হবে। ব্রাহ্মণ যারা বহিরাগত তারা কখনোই কায়স্থ বৈদ্যদের সমগোত্র করে ভাবেনি। সর্বদাই তারা নিজেদের প্রভুত্ব বজায় রেখে চলেছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে কায়স্থ বৈদ্যসমাজ তাদের এক ঘরে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ঐতিহাসিকভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে কায়স্থ এবং বৈদ্যসমাজ তারা যে দেশের চতুর্থ বর্ণের অর্থাৎ শুদ্র সমাজের মধ্যে পড়ে সে নিয়ে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না! তাই এখন কায়স্থ বৈদ্য সমাজের উচিত অনগ্রসর সমাজের সঙ্গে একইভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়া ।
আর তার সঙ্গে বাবাসাহেব আম্বেদকরের Anhiliation of Caste অর্থাৎ জাতপাত বিলুপ্তির যে আন্দোলন তিনি করেছিলেন, সেই আন্দোলনকে সমস্ত জাতি ব্যবস্থা তথা অব্রাহ্মণ সমাজকে একত্রিত করে আন্দোলন করা! মানুষকে সচেতন করা! বিয়ে, পূজা, শ্রাদ্ধের নামে ব্রাহ্মণের লোক ঠকানো বন্ধ করা ।
