সংবিধান প্রণেতা ড. বি.আর আম্বেদকরের পূর্ণাবয়ব মূর্তি উন্মোচিত
ড. বি.আর আম্বেদকরের পূর্ণ অবয়ব মূর্তি স্থাপন
নিজস্ব প্রতিনিধি, রায় দিঘী, সুন্দরবন: যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংবিধানের প্রধান স্থপতি ড. বি.আর আম্বেদকরের একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি উন্মোচন করা হলো। গত ১৪/১২/২০২৫ তারিখে তাঁর ৬৯ তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষ্যে রায় দিঘী ব্লক-এ অবস্থিত রায় দিঘী কলেজ প্রাঙ্গণে এই মূর্তিটির আবরণ উন্মোচন করা হয়। মূর্তিটির আবরণ উন্মোচন করেন এলাকার বিধায়ক ও রায়দিঘী কলেজের অধ্যক্ষ মাননীয় ড.অলক জলদাতা মহাশয়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ড.অলক জলদাতা, (রায় দিঘী বিধান সভার বিধায়ক) প্রদীপ প্রজ্বলন ও মাল্যদানের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এছাড়া মূর্তির পাদদেশে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, পীযুষ কান্তি গায়েন, (লেখক ও প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক), বঙ্কিম চন্দ্র মন্ডল, (প্রফেসর, রবীন্দ্র ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়), শ্রীমন্ত মন্ডল, (প্রাক্তন আয় কর অফিসার ভারত সরকার), ড. শশবিন্দ জানা, (অধ্যক্ষ রায় দিঘী কলেজ) প্রমুখ।
ড. আম্বেদকর কেবল সংবিধান প্রণেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার প্রতীক। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
ড. আম্বেডকরের মূর্তি উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধান অতিথি বলেন, "ড. আম্বেদকর কেবল সংবিধান প্রণেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার প্রতীক। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।" এই মূর্তিটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত, সংগঠিত ও অধিকার আদায় ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হওয়ার মন্ত্রে দীক্ষিত করবে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই মূর্তি স্থাপনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ করা গেছে। মূর্তিটির চারপাশ সাজিয়ে তোলার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থান: রায় দিঘী কলেজ, রায় দিঘী ব্লক, সুন্দরবনপরিচালনায় : রায় দিঘী কলেজ পরিচালন সমিতি।।
তারিখ: ১৪/১২/২০২৫।উদ্বোধক: ড.অলক জলদাতা, রায় দিঘী বিধান সভার বিধায়ক
সংস্থা: রায় দিঘী কলেজ পরিচালন সমিতি।
আম্বেদকরের মূর্তির বিশিষ্টতা
- সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার প্রতীক: প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আম্বেদকরের মূর্তি জাতিভেদ প্রথা এবং অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের স্মারক এবং প্রান্তিক মানুষের সামাজিক ন্যায়বিচারের এক প্রতীক হিসাবে কাজ করে।
- সাংবিধানিক মূল্যবোধ: বেশিরভাগ মূর্তিতে তাঁর হাতে ভারতের সংবিধান থাকে, যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
- অনুপ্রেরণার উৎস: এই মূর্তিগুলো বিশেষ করে দলিত এবং পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। এটি তাঁদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করে।
- প্রকাশ্য স্থানে অধিকারের দাবি: জনবহুল স্থানে এই ধরণের মূর্তি স্থাপন মূলত সমস্ত নাগরিকের জন্য সরকারি বা সর্বজনীন স্থান ব্যবহারের সমান অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
- জ্ঞানের প্রতীক: আম্বেদকরকে অনেক সময় 'জ্ঞানের প্রতীক' (Statue of Knowledge) হিসেবেও অভিহিত করা হয়, যা তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্য এবং শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের ক্ষমতাকে প্রকাশ করে।
আম্বেদকরের মূর্তি স্থাপনের কারণ :
ড. আম্বেদকরের মূর্তি একটি শোষণমুক্ত, সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তাঁর পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে।১. সমতা ও ন্যায়বিচারের আদর্শ প্রচার:
আম্বেদকর সারাজীবন জাতিভেদ প্রথা দূর করতে এবং সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছেন। তাঁর মূর্তি স্থাপন করা হয় মূলত সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য।২. সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা:
তিনি ভারতের সংবিধানের প্রধান স্থপতি। তাঁর মূর্তি এবং তাঁর হাতে থাকা সংবিধানের প্রতিকৃতি দেশের প্রতিটি নাগরিককে তাঁদের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা।৩. শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা:
আম্বেদকরের জীবনের মূল মন্ত্র ছিল— "শিক্ষিত হও, সংগঠিত হও এবং সোচ্চার হও।" তাঁর মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রেরণা দেওয়া হয়।৪. আত্মমর্যাদার প্রতীক:
ভারতবর্ষের দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে আম্বেদকরের মূর্তি আত্মমর্যাদা ও সাহসের প্রতীক। এটি তাঁদের মনে এই বিশ্বাস জোগায় যে, সংগ্রাম ও মেধার মাধ্যমে যে কেউ সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।৫. ঐতিহাসিক অবদানকে স্বীকৃতি:
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং উত্তর-স্বাধীনতা পর্বে রাষ্ট্র গঠনে তাঁর অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখাই মূর্তি স্থাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর আদর্শকে জীবন্ত রাখার একটি মাধ্যম।৬. নারী অধিকার ও মানবিকতা:
আম্বেদকর কেবল দলিতদের নেতা ছিলেন না, তিনি নারী অধিকার ও হিন্দু কোড বিলের মাধ্যমে নারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিলেন। তাঁর মূর্তি মানবিক মর্যাদা ও নারী স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।মূলত, একটি শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন আম্বেদকর দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জিইয়ে রাখতেই তাঁর মূর্তি স্থাপন করা হয়।
--------------

